সবুজের দাম কত?
যদি দেশের প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশবাসীকে আলাদা করে ভোট দিতে ডাকা হত? যেমন, মাটির তলার কয়লা, না মাটির ওপরের বিস্তীর্ণ ঘন জঙ্গল ও অপরিমিত জীববৈচিত্র, কোনটা চাই? খুব সংশয় আছে, ‘এখন আরণ্যক’-এর পাঠকের ঠোঁটে নিজের অজানিতে যে-উত্তরটা আপনা থেকে উঠে আসছে, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে সেটাই প্রতিফলিত হত কিনা। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে দেশের প্রতিটা প্রধান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল একটা খবর, আনন্দবাজার পত্রিকায় তার শিরোনাম এরকম: ‘বন ধ্বংস করে খনি, ছাড়পত্র অদানীদের’। হিন্দুস্থান টাইমস লিখল: ‘সেন্টারস নড ফর মাইনিং ইন ১,৭০,০০০ হেক্টর অফ ফরেস্ট ইন ছত্তিসগড়’।

দ্বিতীয় শিরোনামে অরণ্যের ব্যাপ্তি সংক্রান্ত অংশটা  কিছুটা ভুল বোঝার উদ্রেক করতে পারে বটে, কিন্তু সংবাদটা নির্ভুল। ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল কে? দিল কেন্দ্রের পরিবেশ মন্ত্রকের অধীন এনভায়রনমেন্ট অ্যাডভাইসরি কমিটি। দুটি সন্নিহিত জেলা সরগুজা ও সুরজপুরের অন্তর্বর্তী বিস্তীর্ণ নিরবচ্ছিন্ন সবুজ অরণ্যের মধ্যে পরসা ব্লক থেকে ৮৪১.৫ হেক্টর জঙ্গল চিরতরে হাওয়া হয়ে যাবে, ধরণী হবে বিদারিত। খোলা-মুখ খনি পৃথিবীর উদর উন্মুক্ত করবে, নিষ্কাশন করবে কয়লা।
নিশ্চয় করবে। কয়লা ছাড়া, তা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ছাড়া, সভ্যতার চাকা ঘুরবে কীভাবে? এই কয়লা নিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করবে রাজস্থান বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগম লিমিটেড, কয়লা তুলবে রাজস্থান কোলিয়ারিজ, অদানী এন্টারপ্রাইজের একটা শাখা। এই প্রকল্প নিয়ে এখনও কিছু আইনি খুঁটিনাটি ছাড় পাওয়ার অপেক্ষায় আছে সুপ্রিম কোর্টে, কিন্তু খনি-তরফের আইনজীবীর মতে সেগুলো নস্যি, অপ্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে অদানী গোষ্ঠী পরিবেশ রক্ষার কাজে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বড় মুখ করে প্রচার করছে, তারা গ্রামীণ জনপদে সৌরবিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ও জ্বালানি গ্যাস সরবরাহের কাজ করতে উৎসাহী। সুতরাং জঙ্গলটা থাকছে না। কয়লা আসছে।
ছত্তিসগড়ের রাজ্য বনদপ্তর অবশ্য এই নির্দেশে তেমন খুশি নয়। খুব অদ্ভুত শোনাতে পারে, যেহেতু একইরকম অরণ্য ধ্বংস করে আরও দুটো খনি এখানে চালু আছে - পরসা ইস্ট এবং কেটে বসান, কাজেই নতুন খনি বসাতে আপত্তি কেন, এমন এক মনোভাব এখানে কাজ করেছে। সুতরাং ধরাই যেতে পারে, চতুর্থ আরেকটি খনির বিপক্ষে আওয়াজ তোলার কোনো জায়গাই থাকবে না! আগের দুটো খনির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা এখনও তাঁদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি, খনি মালিকানা আশ্বাস দিয়ে চলেছেন।
রাজ্য বন দপ্তরের মতে এই অরণ্যের বিশিষ্ট জীববৈচিত্রকে হারাব আমরা। এনভায়নরমেন্ট অ্যাডভাইসরি কমিটি ছাড়পত্র দেওয়ার আগে এখানকার জীববৈচিত্র সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিল কি? ‘ডাউন টু আর্থ’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ জানাচ্ছে, না, সে কাজ করা হয়নি (‘সেন্ট্রাল প্যানেল ওপেনস আপ ফরেস্ট ফর অদানী মাইনস ডিস্পাইট ছত্তিসগড়স রিজার্ভেশন’, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। ছাড়পত্র দেবার পরে সে কাজের সূচি বানানো হয়েছে, আগামী দু-বছরের আগে সে কাজ হবার সম্ভাবনা কম। সে কাজটি করবে ইন্ডিয়ান কাউনসিল ফর ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন, আরেকটি সরকারি সংস্থা। এই সংস্থায় কর্মরত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে যে-ছবিটা মেলে তা হল, এর তত্ত্বাবধানে করা সমীক্ষার তলায় কাজ করে একটাই অলিখিত নীতি বা নির্দেশ, এ জঙ্গল তোমারও সম্পত্তি নয়, আমারও সম্পত্তি নয়, অতএব দিল্লি যা চাইছে তাতেই ছাড়পত্রের ছাপ দিয়ে দাও। জীববৈচিত্র সমীক্ষার ফলাফল না দেখেই ছাড়পত্র দেওয়ার নমুনা থেকে এই বিজ্ঞানীদের কথা বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় না।
হিমালয় যেমন নবীন, সেখানকার অরণ্যও নবীন। কিন্তু মধ্যভারতের ভূপ্রকৃতি ও অরণ্য সম্পর্কে সে কথা বলা যায় না। কাজেই আমরা এখনও জানি না আমরা কী হারাতে চলেছি। কিন্তু সেটা যে অমূল্য কিছু তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে দুটো বিষয়ের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে কোনটিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে তা নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধের ওপর। মূল্যবোধ সহজাত নয়। তা আসে আমাদের পারিবারিক-সামাজিক পরিবেশ থেকে। এক-একসময়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক-একটি বিষয়ে মূল্য আরোপ করে বেশি। কয়লা আমাদের মৌলিক প্রয়োজন সাধনের উপকরণ। তার মূল্য সরাসরি টাকার অঙ্কে হিসেবে বের করে ফেলা যায় এক্ষুনি। কিন্তু বনের মূল্য? সেখানকার জীববৈচিত্রের মূল্য? তর্কটা শুরুই হতে পারে না। বনজ সম্পদের মূল্য - কাঠ, পাতা, মধু অন্যান্য গৌণ বনজ উৎপাদনের মূল্য বা বাতাস নির্মল রাখতে তার অবদান, ভূমিজলের সঞ্চয় অক্ষুণ্ণ রাখতে, নদীকে বহমানা রাখতে তার ভূমিকা - ইত্যাদি যদি তুলনীয় যন্ত্রব্যবস্থার নিরিখে হিসেবে করেও ফেলতে পারি, তাও না। কারণ একটা অরণ্য কেবল এটুকুই নয়। তা আসলে আমাদের জীবনবোধের সঙ্গে জড়ানো। আমরা কথায় বলি ভারতীয় জনমানসের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে উপনিষদ, এবং উপনিষদকে আমরা বলি ‘আরণ্যক’।
কিন্তু সত্যিই যদি কয়লা না নিরবচ্ছিন্ন আদিম অরণ্য, কোনটা আমরা চাই তা নিয়ে এই মুহূর্তে ভারতে একটা নির্বাচন প্রক্রিয়া চলে, তার ফলাফল কী দাঁড়াবে? ‘এখন আরণ্যক’-এর প্রতিজন পাঠিকা হাত তুলে রায় দেওয়ার জন্য নিশপিশ করছেন তা আমি মনের ভেতর দেখতে পাচ্ছি বটে, কিন্তু তাঁদেরকেই বলি, নিজের নির্বাচনের কথা ভুলে গিয়ে একবার পরিপার্শ্ব দেখে নিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল কী হত সেটা ভেবে বলুন তো! আ্মার দৃঢ় বিশ্বাস সে কাজ করতে গিয়ে বুক কেঁপে উঠবে। একটা সামান্য আলোকপ্রাপ্ত অংশের বাইরের মানুষকে অরণ্যের মূল্য কী তা আমরা বুঝিয়ে উঠতে পারিনি। ছত্তিসগড়ের অরণ্যবাসী মানুষ, যার জীবিকা জোটে অরণ্যের ওপর নির্ভর করে, এবং যে-মানুষটি ওই খনি খোঁড়া হলে অরণ্য থেকে পাওয়া সহায়তাটুকুও হারাবে, তাকে অরণ্যের মূল্য বোঝানোর প্রয়োজনও হয়তো নেই। কিন্তু এই দুটো অংশের মাঝখানে ভোটবাক্সের রং-বদলানোর নির্ণায়ক ক্ষমতা রাখে এমন বিরাট অংশকে আমরা এখনও যুক্তিবাদ বা পরিবেশের প্রকৃত মূল্য বুঝিয়ে উঠতে পারিনি। দিন যত গড়াচ্ছে কাজটা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ‘এখন আরণ্যক’-এর মতো প্রতিটা পত্রিকার দায় থেকে গেছে সেই অপ্রতিরোধ্যের মুখে দাঁড়িয়েও শেষ শক্তি দিয়ে ভারতের আরণ্যক ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখার।